ব্লুটুথ, ওয়াই-ফাই এবং ওয়াই-ম্যাক্স

Bluetooth WiFi WiMax

ব্লুটুথ (Bluetooth)

অল্প দূরত্বের মধ্যে একাধিক ডিজিটাল ডিভাইসে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য তারবিহীন প্রযুক্তিকে ব্লুটুথ বলা হয়। আরেকটু ব্যাখ্যা করে বললে, ব্লুটুথ হচ্ছে এমন একটি প্রযুক্তি যা দিয়ে একটি ওয়্যারলেস পার্সোনাল এরিয়া নেটওয়ার্ক (PAN) তৈরী করা যায়। খুব কম ক্ষমতার বেতার তরঙ্গ প্রেরণের মাধ্যমে এটি করা হয়। মাত্র 2.5Hz বেতার তরঙ্গ ব্যবহারে এই কাজ করা হয় বলে খুব  সামান্য বিদ্যুতে এর মাধ্যমে ডেটা পাঠানো যায়। সাধারণত ১ থেকে ২০ মিটার দূরত্বের মধ্যে ৭টি ডিভাইসের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। বর্তমানে বেশির ভাগ ইলেকট্রনিক ডিভাইসে বিল্ট-ইন ব্লুটুথ থাকলেও কিছু কিছু ডিভাইসে USB পোর্টের মাধ্যমেও ব্লুটুথ সংযোগ দেওয়া হয়। হাফ ডুপ্লেক্স ডেটা ট্রান্সমিশন মোডে ব্লুটুথে ডেটা ট্রান্সমিশন হয়ে থাকে। 

ব্লুটুথের ইতিহাস

দশম শতাব্দির ডেনমার্কের রাজা হারাল্ড ব্লুটুথ-এর নামানুসারে এর নামকরণ হয় ব্লুটুথ। টেলিকম ভেন্ডার এরিকসন ১৯৯৪ সালে এই ব্লুটুথ আবিষ্কার করেন।  

ব্লুটুথের ব্যবহার

ব্লুটুথের কিছু ব্যবহার নিচে দেওয়া হল:

১) ব্লুটুথ ব্যবহারে কম্পিউটার, মোবাইল ফোন বা যেকোন ডিভাইস যেটাতে ব্লুটুথ আছে, সংযোগ ঘটানো যায় এবং তথ্য আদান-প্রদান করা যায়।

২) জিপিএস রিসিভার, বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, বারকোড স্ক্যানার ও ট্রাফিক কন্ট্রোলার  ডিভাইসগুলোতে ব্লুটুথ ব্যবহৃত হয়।

৩) হার্ট রেট ডিটেকটর বা এই ধরনের ডেডিকেটেড টেলিহেলথ ডিভাইসগুলোতে হেলথ সেন্সর ডেটাগুলোর শর্ট রেঞ্জ ট্রান্সমিশনে ব্লুটুথ ব্যবহৃত হয়।

ব্লুটুথের সুবিধা

ব্লুটুথ ব্যবহারের কিছু সুবিধা নিচে আলোচনা করা হল:

১) ব্লুটুথ একটি ওয়্যারলেস বা তারবিহীন প্রযুক্তি।

২) এটি দামে তুলনামূলক সস্তা।

৩) এটি ইনস্টল করা খুবই সহজ।

৪) বিল্ট-ইন বা ডিভাইসের সাথে ব্লুটুথ ইনস্টল করা থাকলে এটি বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়।

ব্লুটুথের অসুবিধা 

ব্লুটুথ ব্যবহারের কিছু অসুবিধাও রয়েছে:

১) খুব অল্প বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করা হয় তাই এটি একটি স্বল্প পরিসীমা যোগাযোগের নেটওয়ার্ক।

২) একইসময় মাত্র দুটি ডিভাইস সংযুক্ত করে কাজ করা যায়।

ওয়াই-ফাই (Wi-Fi)

Wireless Fidelity শব্দের সংক্ষিপ্ত রুপ হল Wi-Fi। যে ওয়্যারলেস প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক (WAN) তৈরি করা যায় তাকে Wi-Fi বলা হয়। এটি সাধারণত হাই স্পিড ইন্টারনেট এবং ডেটা সঞ্চালন করার জন্য ওয়াই-ফাই রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে থাকে। মোবাইল, ল্যাপটপ এবং বিভিন্ন নেটওয়ার্ক ডিভাইসের মাঝে কোনো ওয়্যার ছাড়াই ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়। এবং আমরা তার ছাড়াই বিভিন্ন ডিভাইসে এই নেটওয়ার্ক তৈরী করতে পারি। এই কানেকশন একটি ঘর বা অল্প কিছু জায়গা জুড়ে ব্যবহার করা সম্ভব। 

ওয়াই-ফাই এর ইতিহাস

জন ও’সুলিভান এবং জন ডেনে নামক দুই ব্যক্তি ১৯৯১ সালে প্রহম এই ওয়াই-ফাই আবিষ্কার করেন। 

ওয়াই-ফাই এর ব্যবহার 

ওয়াই-ফাই এর সবচেয়ে বেশি ব্যবহার দেখা যায় বাসায়। আমরা বাসায় সাধারণত একটি রাউটারে কয়েকটি ফোন, কম্পিউটার বা অন্যান্য ডিভাইস কানেক্ট করে ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকি। এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট IP Address-এ নির্দিষ্ট পাসওয়ার্ড দিয়ে সকল ডিভাইস কানেক্টেড থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট-হোটেল, বাস স্ট্যান্ড বা ট্রেন স্টেশন, অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে ওয়াই-ফাই দেখা যায়।

ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুবিধা

ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুবিধাগুলো নিচে দেয়া হলঃ

  • ওয়াই-ফাই খুবই ইউজার ফ্রেন্ডলি। যে কোনো নেটওয়ার্কের পাসওয়ার্ড জানা থাকলে খুবই সহজে যে কোনো ডিভাইস কানেক্ট করা যায়।
  • খুব কম খরচেই এই নেটওয়ার্ক তৈরী করা যায়।
  • একসাথে অনেক গুলো ডিভাইস কানেক্ট করে ব্যবহার করা যায়।
  • মোবাইল ইন্টারনেটের তুলনায় গতি অনেক বেশি পাওয়া যায়।

ওয়াই-ফাই ব্যবহারের অসুবিধা

ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুবিধাগুলো নিচে দেয়া হলঃ

  • একটি নির্দিষ্ট রেঞ্জের বাইরে এটি ব্যবহার করা যায় না।
  • এই নেটওয়ার্ক ব্যবস্থায় নিরাপত্তা অনেক দুর্বল।
  • ওয়াই-ফাই ডিভাইসটি নষ্ট হয়ে গেলে পুড়ো নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পরে।
  • এর রেডিয়েশনের ফলে শারিরীক সমস্যা হতে পারে।
  • অনেক বেশি ডিভাইস কানেক্ট হওয়ার ফলে অনেক সময় ডাটা স্পিড কমে যায়।

ওয়াই-ম্যাক্স (Wi-Max)

Worldwide Interoperability for Microwave Access বা সংক্ষেপে Wi-Max হচ্ছে একটি ওয়্যারলেস প্রযুক্তি যার মাধ্যমে একটি মেট্রোপলিটন এরিয়া নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায়। তারবিহীন ব্যবস্থায় বিশাল এলাকাজুড়ে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড সেবা পাওয়া যায় এই ওয়াই-ম্যাক্স এর মাধ্যমে। ওয়াই-ম্যাক্স এর দুইটি প্রধান অংশ হচ্ছে বেস স্টেশন অ রিসিভার। বেস স্টেশন হল ইনডোর বা আউটডোর টাওয়ার নিয়ে গঠিত। আর রিসিভার যেকোনো ডিভাইস যেমন কম্পিউটার বা ল্যাপটপে সংযুক্ত থাকে। ১০কিমি থেকে ৬০কিমি পর্যন্ত এই বেস স্টেশনের রেঞ্জ হয়ে থাকে।

ওয়াই-ম্যাক্স এর ইতিহাস

ওয়াইম্যাক্স ফোরাম এই ওয়াই-ম্যাক্স নামটি দিয়েছে। ওয়াইম্যাক্স ফোরাম প্রতিষ্ঠিত হয় স্টান্ডার্ড অনুযায়ী প্রযুক্তিটির বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্যে ২০০১ সালে। ফোরামের মতে ওয়াইম্যাক্স হচ্ছে তারহীন ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কের ব্যবস্থা, যা প্রচলিত বিস্তৃত এলাকায় ক্যাবল বা ডিএসএল এর  একটি বিকল্প প্রযুক্তি।

ওয়াই-ম্যাক্স এর ব্যবহার

মূলত এটি একটি টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ মোবাইল সেলুলার ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের তারবিহীন তথ্য আদানপ্রদান করা। বিস্তৃত একালা জুড়ে যেই সকল নেটওয়ার্ক তৈরির প্রয়োজন হয় সেখানে ওয়াই-ম্যাক্সই সবচেয়ে উপযোগী।  

ওয়াই-ম্যাক্স ব্যবহারের সুবিধা

  • ডেটা ট্রান্সমিশন রেঞ্জ ১০ কি.মি. থেকে ৬০ কি.মি. পর্যন্ত হয়ে থাকে।
  • একটি নেটওয়ার্কে অসংখ্য ব্যবহারকারী কানেক্ট হতে পারে।
  • রিসিভার ডিভাইস হিসেবে যেকোনো কম্পিউটার বা ল্যাপটপের সাথে সংযুক্ত করলেই হয় তাই এটা পোর্টেবল।
  • প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এর সুবিধা পাওয়া যায়।

ওয়াই-ম্যাক্স ব্যবহারের অসুবিধা

  • অনেক বড় এলাকা জুড়ে তৈরি করতে একাধিক স্টেশনের প্রয়োজন হয়।
  • নেটওয়ার্ক তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ তুলনামূলক অনেক বেশি।
  • আবহাওয়া খারাপ হলে নেটওয়ার্ক সিগন্যালে বিঘ্ন দেখা যায়।
  • প্রচুর বিদ্যুৎ শক্তির প্রয়োজন হয় এই নেটওয়ার্ক ব্যবস্থায়। 
শেয়ার:

সিন-সামবিল বিনতে ওবায়েদ

শিখো-তে আইসিটি সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট হিসাবে কাজ করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

two − 1 =